ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ , ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিপো নির্মাণ, ট্যাংক ভাড়ার উদ্যোগ

জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১৬-০৭-২০২৬ ০১:৫৭:১৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-০৭-২০২৬ ০১:৫৭:১৮ অপরাহ্ন
জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা
দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের যে-কোন ধরনের অস্থিরতার মধ্যেও দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিমুক্ত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তেলের মজুত সক্ষমতা ৬০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৭১ দিন এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা ৯০ দিনে উন্নীত করা হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জ্বালানি খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ডিপো নির্মাণ, অব্যবহৃত ট্যাংক সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত ট্যাংক ভাড়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে ৬০ দিনের বেশি জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা ৭১ দিনে উন্নীত করা সম্ভব হবে। লক্ষ্য অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে ৯০ দিনের মজুত নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, জাতীয় জ্বালানি নীতি-১৯৯৬ অনুযায়ী, দেশে ৬০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি তেল মজুতের বিধান রয়েছে। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত থাকায় কোনো সংকট নেই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি নীতিতে ৬০ দিনের কৌশলগত মজুতের কথা বলা হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় আমরা পর্যায়ক্রমে এটি ৯০ দিনে উন্নীত করবো। এ বিষয়ে কাজ চলছে। তবে এখন দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই।

বার্ষিক চাহিদা ও বর্তমান সক্ষমতা

জ্বালানি বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) জন্য দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন।

এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার টন, যার মাসিক গড় চাহিদা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৫০ টন। এছাড়া ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন, জেট ফুয়েলের ৬ লাখ ৬৩ হাজার টন, অকটেনের ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯০০ টন এবং পেট্রোলের ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টন।

বর্তমানে বিপিসির আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ ছয়টি কোম্পানির মোট জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা ১৫ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬ টন। এর মধ্যে ৬৭ হাজার ৬৩২ টন ধারণক্ষমতার অবকাঠামো সংস্কার ও মেরামতের কাজ চলছে।

বর্তমানে বিপিসির নিজস্ব সক্ষমতায় ডিজেল ৫৭ দিন, অকটেন ৪৬ দিন, পেট্রোল ২৯ দিন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৮ দিনের মজুত রয়েছে। এই সক্ষমতাই ৯০ দিনে উন্নীত করতে চায় সংস্থাটি।

ব্যবহার করা হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ট্যাংক

জ্বালানি বিভাগ জানায়, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশনসহ (বিআরটিসি) অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ১ লাখ ৪২ হাজার ২৯৮ টন ডিজেল এবং ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪০০ টন ফার্নেস অয়েল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে।

সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ট্যাংক ভাড়ায় ব্যবহার করতে চায়। পাশাপাশি বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮২ হাজার ২০০ টন ধারণক্ষমতার মজুদাগার সংস্কার করে চালু করা হবে।

এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব বলেন, সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের ট্যাংক ভাড়ার বিষয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলওয়ে ও বিআরটিসি রয়েছে। এসব বিকল্প সুযোগ মাথায় রাখার পাশাপাশি নিজস্ব অবকাঠামো বাড়াতে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ডিজেলের ক্ষেত্রে বিপিসির বর্তমান কৌশলগত মজুত সক্ষমতা ৫৭ দিনের। তবে বিদ্যুৎ ও রেলওয়ের মতো বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ৩ মাসের তেল কিনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মজুত রাখে, সেক্ষেত্রে কোনো নতুন প্রকল্প ছাড়াই দেশের সামগ্রিক জ্বালানি মজুত আরও ১২ থেকে ১৩ দিন বেড়ে যাবে।

মজুত বৃদ্ধিতে আসছে যেসব কর্মসূচি

বিপিসি জানায়, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের আওতায় গত জুনে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোর কমিশনিং সম্পন্ন হয়েছে। নতুন ট্যাংক চালু হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের মজুত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৩৭ টন বেড়েছে। এতে বিপিসির মোট মজুত সক্ষমতা বেড়ে হয়েছে ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৫০৩ টন। ২০২৭ সালের মধ্যে পার্বতীপুরে আরও চারটি নতুন ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া কুমিল্লায় বিদ্যমান অটোমেটেড ডিপো এলাকায় নিজস্ব অর্থায়নে আরও ছয়টি ডিপো নির্মাণ করা হবে।

নারায়ণগঞ্জের মেঘনা পেট্রোলিয়ামের গোদনাইল ডিপোতে ১১ হাজার টন ধারণক্ষমতার দুটি নতুন ট্যাংক এবং ফতুল্লার আলীগঞ্জ ডিপোতে ১৩ হাজার টন ধারণক্ষমতার আরও দুটি ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গোদনাইলে ১ হাজার ৪৫০ টন ধারণক্ষমতার একটি এইচওবিসি ট্যাংক নির্মাণাধীন রয়েছে।

বিপিসি জানায়, এছাড়া পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির প্রধান স্থাপনাগুলোর খালি জায়গায় নতুন ডিপো ও ট্যাংক নির্মাণ প্রকল্প বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা অয়েলের ৯ হাজার ৫০০ টনের দুটি ট্যাংক, মেঘনা অয়েলের ১০ হাজার টনের তিনটি ট্যাংক এবং যমুনা অয়েলের সাড়ে ৫৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার নতুন ট্যাংক।

সিলেটের পদ্মা অয়েল ডিপোর ১ হাজার ৩৭ টন ধারণক্ষমতার তিনটি জেট ফুয়েল ট্যাংক ডিজেল সংরক্ষণের উপযোগী করা হচ্ছে। ভৈরব বাজার ডিপোতে ২ হাজার ১৬৫ টনের পাঁচটি ট্যাংক নির্মাণকাজ চলছে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওমেরার ৪০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ট্যাংকের মধ্যে ৩০ হাজার টন ভাড়ায় নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বিপিসি।

বিপিসির চেয়ারম্যান বলেন, গত জুনে পার্বতীপুর ডিপোর কমিশনিং সম্পন্ন হওয়ায় মজুত সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার টন বেড়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পার্বতীপুরে আরও চারটি এবং কুমিল্লায় ছয়টি ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির খালি জায়গায় নতুন ডিপো ও ট্যাংক নির্মাণ চলছে। পাশাপাশি কেরোসিন ও জেট ফুয়েলের চাহিদা কমে যাওয়ায় উদ্বৃত্ত ট্যাংকগুলো ডিজেল সংরক্ষণের উপযোগী করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ট্যাংক ভাড়ায় নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নতুন জমি অধিগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে অচল ট্যাংক সচল করা, কেরোসিনের ট্যাংক ডিজেলে রূপান্তর এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রেলওয়ের অব্যবহৃত ট্যাংক ব্যবহার করলে দ্রুত মজুত সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। তাদের মতে, এটি সরকারের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

সূত্র: বাসস

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ